মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা

 

মনোরম সৌন্দর্যের লীলাভূমি স্বাধীন বাংলার ভুখন্ড পেতে ৩০ লাখ শহীদের রক্ত, আর ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জত বিসর্জন দিতে হয়েছে। সারা দেশের ন্যায় বরগুনাবাসীও পাকিস্তানী হানাদারদের নৃশংসতার শিকার হয়েছে। বরগুনায় চালানো হয়েছে গণহত্যা, নারী নির্যাতন, লুটপাট ইত্যাদি। বিজয়ের মাস এলে সকলের মন যেমন আনন্দ ও গর্বে ভরে ওঠে, তেমনী স্বজনহারা ও নির্যাতনের শিকার মা-বোনদের হৃদয় ব্যথায় ভারাক্রান্ত হয়ে যায়। তাদের হৃদয় পটে আকাঁ আছে স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন বেদনাদায়ক স্মৃতি । এ জেলার যুদ্ধের ইতিহাসও হৃদয় স্পর্শী। বরগুনা জেলার মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা বলে বরগুনার মুক্তিযুদ্ধের যে ইতিহাস জানা গেছে তা সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হলো।

 

মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণাঃ

 

একাত্তরের ৭ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ মুক্তিকামী মানুষদের যুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রেরণা জোগায়। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বরগুনার মানুষ সেদিন সরাসরি উপস্থিত থেকে বঙ্গবন্ধুর আহবান শুনতে পাননি। পরের দিন ৮ মার্চ বেতারের মাধ্যমে তারা তাঁর আহবান শুনেছেন। বঙ্গবন্ধুর আহবান শোনানোর জন্য সেদিন তাঁর ভাষণ মাইকের মাধ্যমে প্রচার করা হয়। বঙ্গবন্ধুর আহবানে উজ্জীবিত হয়ে সেদিন বরগুনার শান্তিকামী মানুষ একাত্মতা ঘোষণা করে এবং সংগঠিত হতে শুরু করে।

 

সংগ্রাম পরিষদ গঠনঃ

 

০৭ মার্চ ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের প্রেরণার মধ্য দিয়ে বরগুনায় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। আওয়ামী লীগের সভাপতি আঃ লতিফ মাষ্টার ও সাধারণ সম্পাদক এডঃ নুরুল ইসলাম শিকদার যথাক্রমে সংগ্রাম পরিষদেরও সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এ সময় ছাত্রলীগের সভাপতি মোঃ জাহাঙ্গীর কবির ও সাধারণ সম্পাদক মোঃ আব্দুর রশিদ মিয়া এবং ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মনোয়ার ও দুলাল মাতুববর প্রমুখ উক্ত সংগ্রাম পরিষদের সদস্য ছিলেন। এছাড়া এম.এন.এ আসমত আলী শিকদার ও এম.পি.এ রোসমত আলী খান,ছাত্রনেতা সিদ্দিকুর রহমান ও ধীরেন্দ্র চন্দ্র দেবনাথ শম্ভু সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা ছিলেন। উক্ত সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে বরগুনা মহাকুমায় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় এবং প্রত্যেক থানায় প্রশিক্ষণ শুরু হয়। বরগুনা থানার মাঠ ও ট্রেজারীর মাঠে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের সকল ছাত্রদের সাথে বরগুনার যুবকগণ প্রশিক্ষণ শুরু করে।

 

মুক্তি বাহিনী গঠনঃ

 

২৬ মার্চের পরে পাক সেনারা বরগুনা আক্রমন করে। নিরীহ মানুষদের জেলখানায় নিয়ে হত্যা করে এবং মহিলাদের উপর পাশবিক নির্যাতন চালায়। অনুরূপভাবে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী অন্যান্য থানায় হত্যা ও নির্যাতন চালায়। সে সময় সংগঠিত মুক্তিপাগল যুবকেরা শহর ছেড়ে আড়ালে চলে যান এবং বিভিন্ন এলাকায় সিদ্দিকুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর দল গঠন করেন। সিদ্দিকুর রহমান, চান্দখালীর দুলাল মৃধা ও আঃ রশিদ মিয়া মির্জাগঞ্জ থানার চালিতাবুনিয়ার আনছারের কাছ থেকে একটি রাইফেল সংগ্রহ করে। অতঃপর গুদিঘাটা মোসলেম মাষ্টারের বাড়ীর উত্তর পাশে চান্দখালীর ভাড়ানী খালে পাক সেনা ভর্তি স্পীডবোটে মুক্তিযোদ্ধাগণ কর্তৃক প্রথম গুলি বর্ষণ করা হয়। ইতোপূর্বে সারা বরগুনা মহাকুমায় মুক্তিবাহিনীর দল গঠন করে পাক সেনাদের মোকাবেলা করার প্রস্ত্ততি গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে এম.এন.এ আসমত আলী শিকদার ও এম.পি.এ শাহজাদা আব্দুল মালেক খান ভারত চলে যান। এম.এন.এ আসমত আলী শিকদার এবং নবম সেক্টর কমান্ডার মেজর এম.এ জলিলের পরিকল্পনা অনুসারে ক্যাপ্টেন মেহেদী আলী ইমামের নেতৃত্বে পটুয়াখালী ও বরগুনার সাব সেক্টর বুকাবুনিয়ায় গঠন করা হয়। টু-আই.সি জহির শাহ আলমগীর এবং ৬ জন উপদেষ্টা নিয়োগ করে পটুয়াখালী ও বরগুনায় এলাকাভিত্তিক দায়িত্ব দেয়া হয়। এরপর পটুয়াখালী ও বরগুনার কয়েক শত যুবক প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে গমণ করে। প্রশিক্ষণ শেষে সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন স্থানে পাক-হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।

অপর দিকে বরগুনা মহাকুমায় থানাভিত্তিক যুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য দল গঠন করা হয়েছিল। সাব কমান্ডার মেহেদী আলী ইমাম এ দল গঠন করেন। এর মধ্যে বরগুনায় জুলফিকার আহম্মেদ জলফু এবং আঃ ছত্তারকে দায়িত্ব দেয়া হয়। বেতাগীতে দায়িত্ব দেয়া হয় নায়েক সুবেদার আঃ মোতালেব, হুমায়ুন কবির হিরুকে। বামনায় মোবারক মল্লিক, আঃ মজিদ মিয়া এবং পাথরঘাটায় আলতাফ ও আঃ খালেক, আমতলীর দায়িত্বে ছিলেন সুবেদার হাতেম ও আনসার কমান্ডার আলতাফ হোসেন। সুবেদার হাতেমের ক্যাম্প ছিল আগাঠাকুর পাড়ায়। হঠাৎ কলাপাড়া থেকে আসা পাক সেনারা নীলগঞ্জ নদী হতে আগাঠাকুর পাড়ার ক্যাম্পে আক্রমন চালায়। সুবেদার হাতেমের নেতৃত্বে সেখানে ভয়াবহ সম্মুখ যুদ্ধ হয়। অপর দিকে বেতাগী থানার বদনীখালীতে সুবেদার আঃ মোতালেবের নেতৃত্বে পাক সেনাদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধ হয়।

 

বরগুনায় গণহত্যাঃ

 

বরগুনাবাসীর জন্য রক্তাক্ত স্মৃতি বিজড়িত দুটো দিন ২৯ ও ৩০ মে। একাত্তরে এ দুটি দিনে বরগুনা জেলখানায় আটককৃত নিরীহ বাঙ্গালীদের গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বরগুনা শহরের পৌর এলাকার শহীদ স্মৃতি সড়কের পাশে শহীদদের গণকবর যেখানে বরগুনার মুক্তিকামী মানুষদের মাটি চাপা দেয়া হয়েছে। ১৯৯২ সনে সেখানে একটি স্মৃতি সৌধ নির্মাণ করা হয়েছে। স্মৃতি সৌধের শ্বেত পাথরে লেখা রয়েছে শহীদদের নাম। মুক্তিযোদ্ধারা বরগুনা ছেড়ে লোকালয়ে যাবার সুযোগে মুসলিমলীগ, জামায়াত ও অন্যান্য পাকিস্তানপন্থীরা বরগুনা শহর দখল করে এবং পাক-বাহিনীকে বরগুনা নিয়ে আসে। তখন বরগুনা শহর ছিল প্রায় জনমানবহীন। এসডিও’র জেটিতে পাক-বাহিনী পজিশন নিয়ে কোর্ট বিল্ডিং এলাকায় কিছু লোক জড়ো করে ভাষণ দেয়। পরের দিন ১৫ মে পাথরঘাটা থানার বেশ কয়েকজনকে ধরে এনে বিষখালী নদীর তীরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সেদিন মুক্তিযোদ্ধাদের আহাজারী ও স্বজন হারাদের কান্নায় আকাশ বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। বিষখালী নদীর পানি রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল। আর এ হত্যাকান্ডে নেতৃত্ব দিয়েছিল, পটুয়াখালী জেলা সামরিক আইন প্রশাসক মেজর নাদের পারভেজ। এসময় পাথরঘাটার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী লক্ষন দাস, তার ছেলে কৃষ্ণ দাস, অরুন দাস ও স্বপন দাসকে ধরে এনে বরগুনা কারাগারে আটক রাখা হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে অবস্থানের কারণে সাবেক সিও আতিকুল্লাহ, এস আই আবদুল মজিদ, সিপাহী আড়ি মিয়া ও আবদুল জববার এবং বরগুনার সিদ্দিকুর রহমান (পনু) চেয়ারম্যানকে পটুয়াখালী নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

২৮ মে পটুয়াখালী জেলা সামরিক আইন প্রশাসক মেজর নাদের পারভেজ বরগুনায় আসে এবং ২৯ মে বরগুনা জেলখানায় প্রহসনমূলক বিচারের ব্যবস্থা করে গণহত্যা শুরু করে। জেলখানার উত্তর-পশ্চিম পাশে বরগুনা জেলা স্কুল অবস্থিত। প্রতিদিনের ন্যায় সেদিনও ছাত্ররা স্কুলে এসেছিল। ক্লাস শুরুর ঘন্টা বাজার সাথে সাথেই প্রচন্ড গুলির শব্দে শহরময় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, সবাই দিক-বিদিক ছুটোছুটি শুরু করে দেয়। বরগুনা জেলখানায় গুলিবিদ্ধ হয়ে তখন একের পর এক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। প্রথম দিন তারা ৫৫ জনকে হত্যা করেছিল। অনেকে সেদিন গুলি খেয়ে অচেতন অবস্থায় পড়ে রয়েছিল। কিন্তু তাদেরও শেষ রক্ষা হয়নি। পরের দিন আবারও ১৭ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ জেলায় মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মীর মোশারেফ হোসেন,নায়েক মোঃ আলতাফ হোসেন,নগেন্দ্রনাথ ধুপী,নাসিরউদ্দিন তাং,এম.এ.বারেক খান,মজিবর রহমান কনক,আলী আহমদ খান,আলাউদ্দিন সহ অনেক মুক্তিযোদ্ধা সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন।

 

বরগুনা মুক্ত দিবসঃ

 

আমতলী থানাকে আঃ রব,আনছার কমান্ডার আলতাফ হোসেন, পাশা তালুকদার ,আফাজ বিশ্বাস,নিজাম উদ্দিন তালুকদার ও আসমত আলী কেরানীর নেতৃত্বে মুক্ত করা হয়। সুবেদার আঃ মোতালেব, মোবারক মল্লিক এবং অন্যান্য কমান্ডাররা সম্মিলিতভাবে বামনা থানাকে মুক্ত করেন। বরগুনা থানা থেকে ২৪ শে নভেম্বর পাক-হানাদার বাহিনী সদলবলে রাতের আঁধারে পালিয়ে যায়। অপর দিকে মুজিবনগর অস্থায়ী সরকার কর্তৃক মুজিব বাহিনী গঠন করে স্বাধীনতার পূর্বে বরগুনা মহাকুমায় প্রেরণ করেন। বরগুনা বেতাগীর দায়িত্বে আঃ রশিদ মিয়া, আমতলীতে জি.এম. দেলোয়ার ও জালাল আহম্মেদ, বামনা ও পাথরঘাটায় আনোয়ার হোসেন খানকে মুজিব বাহিনীর দায়িত্ব দেয়া হয়। ২৭ শে নভেম্বর-১৯৭১ বরগুনা মহাকুমা পাকহানাদার মুক্ত হয়। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। বঙ্গবন্ধু দেশে প্রত্যাবর্তন করে তার নির্দেশে বরগুনা মহাকুমা প্রশাসকের নিকট অস্ত্র জমা দিয়ে সকল মুক্তিযোদ্ধা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন।

ছবি


সংযুক্তি